২৬শে মার্চ, ২০১৯ ইং, মঙ্গলবার

নাটক নিয়ে নাটকীয়তার অবসান হোক

আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

চর্যাপদের হাত ধরে সুদীর্ঘ ইতিহাস পেরিয়ে বাংলা নাটক আজকে যে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে তার মুল অবদান নাট্যকর্মীদের। নানান ইতিহাস ঐতিহ্যের হাত ধরে এগিয়ে চলা বাংলা নাটক কখনো লড়াই সংগ্রামের হাতিয়ার হয়েছে, কখনো হয়েছে শুধুমাত্র চিত্ত বিনোদনের পাথেয়। বলা হয়ে থাকে নাটক সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম হাতিয়ার। এই হাতিয়ারকে কাজে লাগিয়ে সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয়নি একজন নাট্যকর্মীর জীবনযাত্রা।

পেটে গামছা বেধে থিয়েটার করা, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো-এই জাতীয় বাক্যালাপেই যেনো থমকে দাঁড়ায় একজন নাট্যকর্মীর আশা আকাঙ্খা ভরসার স্থল। যারা কেন্দ্রমুখী তাদের দু একজনের গল্প ভিন্ন হলেও মফস্বল সহ অন্যান্য সবার গল্পটা অনেকটাই ব্যাতিক্রম।

খুব বেশী দিন আগের কথা নয়; যখন মঞ্চ নাটক দেখার জন্য হলভর্তি দর্শক পাওয়া যেতো। শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে দর্শকের উপচে পড়া ভীড় দেখা যেতো রাত ১২ অবধি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নাট্যকর্মীদের একমাত্র ভরসাস্থল সেসব জায়গাগুলোতেও এখন ভাটা পড়েছে প্রায়। বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৫-২০ দিন টানা খাটাখাটুনির পরে যখন একজন নাট্যকর্মী দেখতে পায় তার সামনে বসা দর্শকদের সবগুলো মুখই পরিচিত। তখন নিত্যান্ত দায়ে পরে নাটকের দর্শনী করতে হয়। পথ নাটকগুলোও দিন দিন আটকে যাচ্ছে বিদেশী এনজিও গুলোর গন্ডিতে। বিদেশী এনজিও কিংবা সরকারি কোনো প্রকল্পের নাটক কালেভদ্রে দেখা গেলেও দেখা মিলছে না নাটকের আদি সত্ত্বা পথ নাটকের।

এতে করে নাটকের সংগঠনগুলো লাভবান হলেও একজন নাট্যকর্মী তার নূন্যতম সম্মানীটুকুও পাচ্ছেন না।

দুই থেকে তিন মাস নাটকের মহড়া শেষে মঞ্চে এসে দাড়ালেও যখন দেখা যায় দর্শক হিসেবে যারা এসেছেন তারা বেশিরভাগই নাট্যকর্মী কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মী এবং মঞ্চে থাকা মানুষগুলোর ভাই বন্ধু আত্মীয়-স্বজন তখন আসলে ‘‌‍‍সমাজের প্রয়োজন’ শব্দটা একজন নাট্যকর্মীকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুমুলভাবে। বলা যেতে পারে যে তারা কি সমাজে বাইরে? অবশ্যই না। তারাও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কিন্তু কথা হলো নিজেরা নাটক নির্মাণ করে নিজেরাই তা দেখে নাটকের মাঝে নাটক করার আদতে কোনো মানে আছে কি?

‘আসুন ভাই, দর্শনীর বিনিময়ে নাটক দেখুন। অমুক রচিত, তমুক পরিচালিত আমাদের ১৪ হাজারতম প্রযোজনা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আরম্ভ হতে যাচ্ছে অমুক মঞ্চে। যারা এখনো টিকেট সংগ্রহ করেননি তারা টিকেট সংগ্রহ করে অনুগ্রহ পূর্বক হলরুমে প্রবেশ করুন। আর উপভোগ করুন আমাদের আজকের নাটক।’

কাউন্টারে বসে একদিকে একজন বলেই যাচ্ছেন। অন্যদিকে গেটে দাঁড়িয়ে থাকা টিকিট চেকার গালভর্তি হাসি নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন কিংবা পরিচিতদের দেয়া সৌজন্য টিকিটগুলো সংগ্রহ করছেন। মাঝে মধ্যে দু’একজন টিকিট সংগ্রহ করল্ওে সেটা দশ থেকে বিশের কোটাতেই থেকে যাচ্ছে। আর প্রদর্শনী শেষে হিসেব কষতে হচ্ছে সংগঠনের গচ্ছতি টাকা থেকে কতটা খসলো।

পায়ে হেটে কিংবা নিজের কাজ ফেলে পেটে গামছা বেধে সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে যে নাট্যকর্মী নাটকের শো করলো শুধুমাত্র পরিচিতদের হাততালির বিনিময়ে শো শেষে তার প্রাপ্তিটা কোনখানে?

‘ওহ তোমার ওই ডায়ালগটা তো খুব সুন্দর হইসে। বাহ বাহ। এগিয়ে যাও।’

এরকম দু চারটে কথা কেউ কেউ বলে থাকেন। উৎসাহ দেন। কিন্তু যখন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে তখন হতাশাজনক পরিস্থিতির শিকার হয়ে বিদায় নিতে হয় একজন স্বপ্নবাজ নাট্যযোদ্ধার।সমাপ্তি ঘটে সমাজ পরিবর্তনের প্রবল ইচ্ছের।

-তো কি? আবার নতুন কাউকে ডাকো। তাকে দিয়ে কাজ করাও। নইলে তালা বন্ধ করে রাখো।’
আর ফান্ড?

সেটা কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। সেখানে নাট্যকর্মীর মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই।

একজন থিয়েটার কর্মী নাটকের প্রয়োজনে শুধুমাত্র তার থিয়েটার ছাড়া অন্য থিয়েটারে কাজ করতে পারবে না। কেনো? থিয়েটার কর্মীদের তাহলে নাটকের প্রয়োজনটা কেনো শেখানো হয়? এক থিয়েটারের কর্মী অন্য থিয়েটারের হয়ে নেপথ্যে অথবা মঞ্চে কাজ করলে কি আমাদের সক্ষমতা বাড়ে না? এতো যদি বাধ্যবাধকতা থাকে তবে যৌথ প্রযোজনায় কেন কাজ হয় না? যৌথ উদ্যোগে কেনো নাট্যৎসব হয় না? আর নাটকে নারী কর্মী সংকট। সে আর নাইবা বললাম।

জেলায় জেলায় শিল্পকলা একাডেমি থাকলেও নিয়মিত কার্যক্রম না থাকায় নাট্যচর্চায় যেমন বাধা সৃষ্টি করছে তেমনি একাডেমীক কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে সরকারী কলেজ কিংবা সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নাট্যকলা বিভাগ চালু হচ্ছে না। হাতেগোনা চার পাঁচটা নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া নেই অন্য কোনো সরকারী কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়; যেখানে নাট্যকর্মীরা তার স্বপ্নেরবীজ বপন করতে পারবে। বাংলা সহপাঠে নাটকের একটা অধ্যায় থাকলেও নাটকের সাথে সম্পর্ক না থাকায় বাংলা শিক্ষক-ছাত্রের মাঝে সম্পর্কটা থেকে যাচ্ছে পরীক্ষার খাতা অবধি। স্কুল কলেজে নাটকের শিক্ষক কিংবা নাটকের কোনো কার্যক্রম হচ্ছে না প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে।

আপনি কি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন? নিজের ছেলেকে নাট্যকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান? মেয়ের জামাই হিসেবে নাট্যকর্মী খুঁজছেন? কিংবা অফিসে চাকরি দেবেন বলে, যা করে বেচারা অন্তত পেট চালাতে পারবে। দশ বছর থিয়েটার করার অভিজ্ঞতা আছে। চাইলে বলতে পারেন। আপনিও তো সমাজেরই অংশ। সমাজ পরিবর্তনের ভুমিকায় যে তার জীবনের দশটা বছর পার করে দিলো; তার জন্য এটুকু করা কি আপনার সামাজিক দায়িত্ব কর্তব্যবোধের মধ্যে পরে না? নাকি সামাজিক দায়বদ্ধতা শুধুমাত্র পরের ছেলের। আর পারিবারিক দায়বদ্ধতা নিজের ছেলের?

ওহ দুঃখিত। সে দায়িত্ব তো আর আপনার না। সেজন্য তো রাষ্ট্র আছে। কিন্তু জানেন কি, আমার কাছে নাটকের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বলে মনে হয় রাষ্ট্রকেই। যেখানে আপনি-আমি-আমরা সবাই অভিনেতা। যে যার ভূমিকায় অভিনয় করে যাচ্ছি অভিনব কায়দায়।

এদিক দিয়ে চিন্তা করলে আমরা সবাই অভিনেতা। সবাই নাট্যকর্মী। এতো কিছুর পরেও আমরা নিজেদেরকে নাট্যকর্মী হিসেবে পরিচয় দেই স্বগর্বে। পেটে গামছা বেধেই কাজ করি এবং নিজের খেয়ে বোনর মোষ তাড়াই।

জয় হোক নাটকের। জয় হোক মানবতার। পরিবর্তন হোক সমাজের। আর অবসান হোক এই নাটকীয় নাটকের।

নওশাদ ফাহিম, নাট্যকর্মী, বরিশাল থিয়েটার

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
মার্চ ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১