২৪শে মে, ২০১৯ ইং, শুক্রবার

পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে পায়রায়

আপডেট: মে ১৫, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

‘ল্যাংগা চিতাং, ল্যাংগা পিয়াং , লাজো… লাজো’। নতুন যে কারও কাছে উদ্ভট মনে হলেও এগুলো আসলে চীনা শব্দ। তবে তার থেকেও হকচকিয়ে যাওয়ার বিষয় হচ্ছে শব্দগুলো উচ্চারণ করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছেন পটুয়াখালীর বিভিন্ন গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষরা। এ চিত্র এই জেলার পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশেপাশের দোকানগুলোয়। চীনের প্রকৌশলী ও কর্মীদের কাছে তাদের নিত্যদিনের দরকারি শব্দগুলো শুনে শিখে নিয়েছেন এরা। এখন উল্টো তাদেরই আকৃষ্ট করতে এসব শব্দ বলছেন স্থানীয় দোকানদাররা।

সম্প্রতি পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে প্রকল্প এলাকার আশেপাশের এলাকা ঘোরার সময়ে এসব শব্দ কানে আসে। এর আগে চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকায় শব্দগুলো অপরিচিত না হলেও যারা এসব বলছেন সেই স্থানীয় দোকানদারদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে চীনা ভাষা রপ্ত করার বিষয়টা আমাদের আগ্রহী করে তোলে। একটা দোকানে দাঁড়িয়ে শব্দগুলোর অর্থ জানতে চাইলে দোকানদার মাসুম বিল্লাহ বলেন, ল্যাংগা চিতাং অর্থ ডিম, ল্যাংগা পিয়াং মানে পরোটা, লাজো মানে কাঁচা মরিচ।

জানতে চাই, কীভাবে চীনা ভাষা শিখলেন? এসময় তিনিসহ আশেপাশের আরও দু’চারজন দোকানদার সেখানে জড়ো হন। তারা বলেন, চীনাদের কাছে প্রথমে ইশারা ভাষায় তারা জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। চীনাদের কেউ বাংলা জানেন না। ইংরেজিও খুব কম জানে তারা। আমরাও ইংরেজি জানি না। তারা আমাদের কাছে ‘ল্যাংগা চিতাং’ বলে ডিম দেখিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করেছে এর দাম কত? আমরাও ইশারা দিয়ে, হাতে দেখিয়ে আর বাংলা ভাষায় বলে তাদের দাম জানিয়েছি। এমন করেই তারা জিনিস দেখিয়ে তাদের ভাষায় এর নাম বলতো, আর আমরা আমাদের মতো করে দাম বলতাম। এভাবে তাদের কাছে জিনিসপত্র বেচতে বেচতে বিভিন্ন জিনিসের চীনা নাম শিখে ফেলেছি। এখন এখানকার বেশিরভাগ দোকানদার চীনা ভাষায় জিনিসপত্রের নাম বলতে পারে। বলার ধরনেও এখন তেমন আর জড়তা নেই স্থানীয় বাংলাদেশি এই দোকানদারদের।

শুধু ভাষাতেই নয় এখানকার জীবনযাত্রাও একধরনের পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে যেন। আগে যে মানুষটি গ্রামের ক্ষেতখামারে দিন মজুরের কাজ করতো এখন জামা-জুতা পরে নিপাট ভদ্রলোক সেজে সকালে ব্যবসা কেন্দ্রে এসে বসেন। পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রর আশেপাশে ঘুরে দেখা গেলো নতুন জনপদে নতুন অর্থনীতির সৃষ্টি হয়েছে।

চার বছর আগেও এক অজ পাড়াগাঁ ছিল পায়রার এই দিকটা। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় সেই পায়রায় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হওয়ায় সেখানে এখন সৃষ্টি হয়েছে শহুরে আবহ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, এখন অনেক দূরের মানুষও এখানে এসে ব্যবসা করছেন। বেশিরভাগই ব্যবসায়ী নিজেদের প্রয়োজনে শিখে নিয়েছেন চীনা ভাষা। চীনাদেরও অনেকে বাজারে এসে নিজেদের প্রয়োজনে শিখে নিয়েছেন ভাঙা ভাঙা বাংলা। বলছেন। দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলার সময় কানে এলো, ভাঙা বাংলায় কেউ বলছেন ‘পনচাস’। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখা গেলে অদূরের এক দোকানে দাম পরিশোধ করছেন বিদ্যুৎকেন্দ্রের একজন চীনা কর্মী। বোঝা গেলো, নিত্যকার প্রয়োজনে ভাষার এই বিনিময় ঘটেছে দু’পক্ষেরই মধ্যে।

পায়রার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কাজ করছেন প্রায় নয় হাজার শ্রমিক। এরমধ্যে তিন হাজার শ্রমিক চীনা। এদের বসবাসও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে। ফলে তারা কেনাকাটা করেন স্থানীয় বাজার থেকেই।

স্থানীয় বাজারের একটি দোকানের নাম আল-আমিন ট্রেডার্স। এর কর্মচারী হুমায়ূন কবীর জানান, তিনি বছরখানেক হলো এখানে এসেছেন। তার দোকানের বেশিরভাগ ক্রেতাই চীনা নাগরিক। অনেকটা শহরের সুপারশপের মতো দোকানটিতে এলপিজি সিলিন্ডার থেকে শুরু সবজি পর্যন্ত পাওয়া যায়। তিনি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের আগে এখানে কিছুই ছিল না। ক্রেতাদের একটা বড় অংশ চীনা হওয়ার কারণে চীনা ভাষায় অনেক শব্দই বলতে পারেন তিনি।

হুমায়ুন কবিরের মতোই লোকমান, মালেক ব্যাপারী, নাসির উদ্দিন নামের ব্যবসায়ী ও দোকান শ্রমিকরা শামিল হয়েছেন এই নতুন যাত্রায়। অনেক শ্রমিক কাজ করাতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এই অজপাড়াগাঁয়ে।

রোশনি এন্টারপ্রাইজ নামের একটি কাপড়ের দোকানের মালিক নাছের উদ্দিন। তিনি জানান, খুব বেশিদিন হয়নি এখানে তিনি দোকান দিয়েছেন। দোকানে কী কী পাওয়া যায় জানতে চাইলে নাছের জানান, শ্রমিকরা সাধারণত ট্রাউজার, গেঞ্জি পরেন। এছাড়া কেডসও বিক্রি করেন তিনি। পাশাপাশি নির্মাণ কাজের কারণে কেন্দ্র এলাকায় প্রচুর ধুলা থাকায় হাত মোজা, পা মোজাও বিক্রি হয়। এছাড়া মুখের মাস্কও ভালো চলে বলে তিনি জানান।

সবজি বিক্রেতা শৈলেন সরকার জানান, চীনারা খুবই সচেতন। খুব যাচাই বাছাই করে তবেই সবজি কিনে। দামাদামিও করে খুব। তবে তিনি জানান, এরা এমনিতে সরল। কিন্তু চীনাদের সেই সরলতার সুযোগ নেন না। ন্যায্য দামে তাদের কাছে সবজি বিক্রি করেন তিনি। সবজি বিক্রি করতে করতেই শিখেছেন, ‘ইবাই’ মানে একশ’ টাকা, ‘ইছান’ মানে এক হাজার টাকা, এমনকী এখন এক থেকে এক হাজার পর্যন্ত সব ধরনের সংখ্যাই চীনা ভাষায় বুঝতে ও বলতে পারেন তিনি।

কথা হয় তানভীর হোটেলের মালিক মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে। কথা বলার সময়ই বেশ কয়েকজন চীনা শ্রমিক পরোটার আর ডিম ভাজি কিনে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘ল্যাংগা চিতাং’ মানে ডিম ভাজি, ‘ল্যাংগা পিয়াং’ মানে পরোটা। ‘লাজো’ মানে কাঁচা মরিচ। তিনি অবলীলায় চীনা শ্রমিকদের সঙ্গে গল্প করতে করতেই পরোটা আর ডিম ভাজি বিক্রি করছেন।

এককালে কাঠ ব্যবসায়ী ছিলেন আবদুল মালেক। চীনাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে এসে তিনি এখন মাছ ব্যবসায়ী। ভালো ব্যবসা হচ্ছে বলে জানান তিনি। আরেক পাশের ফলের দোকানের ফারুক বললেন, এখন ভালোই আছেন তিনি। তার দোকানে আপেল, কমলা, কলা, ডাব আর কাঁচা আম বিক্রি হচ্ছে। দেশি শ্রমিকদের পাশাপাশি চীনা শ্রমিকরা তার দোকানে আসছেন হরদম।

প্রায় ছয় হাজার দেশীয় শ্রমিকদের সঙ্গে তিন হাজার চীনা শ্রমিক পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুই ইউনিট নির্মাণ করছে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ চলছে। এখানে একজন চীনা শ্রমিক মাসে এক লাখ টাকার বেশি আয় করেন। তার নিজস্ব প্রয়োজনের সব কিছুই এখান থেকেই মেটান তিনি। স্থানীয় বাজারে চীনা জামা-জুতো থেকে মাস্ক সবই মিলছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে এসে জানা গেলো, এখন কাজ চলা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আরও একটি সমান ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। ফলে এখানে এই শ্রমিকরা আরও অনেকদিন থাকবেন। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অর্ধেক মালিকানাও রয়েছে চীনের হাতে। কারণ, বাংলাদেশে চায়না পাওয়ার কোম্পানি কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে। ফলে এখানে চীনারা আরও অনেক বছর থাকবেন। আর তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের সূত্র ধরে পায়রা ও আশেপাশের এলাকাগুলোতে নীরবে ঘটে যাবে কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
মে ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« এপ্রিল    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
Website Design and Developed By Engineer BD Network