২৬শে মার্চ, ২০১৯ ইং, মঙ্গলবার

পুরনো স্মৃতির রসের হাড়ি

আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

কুয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে গুঁটি গুঁটি পায়ে শীত এসে জেঁকে বসেছে। রাতে শীতের কিছুটা কষ্ট পেলেও, দিনে বেশ ভাল লাগছে। শীতের অনুভূতি বিচিত্র। গাছের পাতাঝরা কুয়াশায় মোড়া শীতের ভোর, কঁচি ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দুর ঝলমলে আলো দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। মনে হয় এ-যেন এক এক ফোঁটা মুক্তা। হালকা রোদে চকচক করছে তার আলোর ঝলকানি। যা দেখলে উদাস মনে যেমন নানা রং ঢংয়ের গান জাগে, জাগে কবিগুরুর অনেক কবিতা, মনকে প্রাণচঞ্চল আনন্দমুখর করে তোলে।

মাঝে মাঝে একতারার বৈরাগী বাউল গান শুনতে মন চায়। শীতের এই আমেজে নানা পার্বন আনন্দ উৎসব কৃষক পরিবারে বয়ে চলে সুখ। তাদের আনন্দের হিল্লোল দেখলে মনে হয় যেন খুশির ঈদ-পুজা-কিংবা ক্রিসমাসের আনন্দ। আসলে তো এই আনন্দ বাংলার ঘরে ঘরে পৌষ-পার্বনের, নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে পিঠা-পায়েস আর নবান্নর উৎসব, যা বাংলার ঐতিহ্য ও গর্ব।

শীতের ভোরে চারিদিকে ঘন কুয়াশার আলো-আঁধারীতে পথচলা, নরোম কঁচিঘাসে পা দিয়ে চলতেই পা ভিজে যাচ্ছে, গায়ে হালকা গরম কাপড়। শীতের ঠাণ্ডা হাওয়ায় চোখ জ্বলে চোখের জল ঝরছে। শীতের কাঁপন, কি যে ঠাণ্ডা, এ সময় একটু উত্তাপ পেলে মন্দ হতো না। চারপাশে তাকিয়ে খুঁজছি, কোথাও কিছু মেলে কি-না, যা জ্বালিয়ে তবে একটু গরম হাওয়া যাবে। হঠাৎ চোখে পড়ল খড়ের গাদা, পরন্ত বিকেলে কুলোবধূরা হাতের কাজ সেরে গরু-বাছুর তুলে নদীর ঘাটে পানি আনতে যাবার পথে কিছু খড়কুটো টেনে গুছিয়ে স্তুপ করে রেখে গেছে।

তার থেকে খানিকটা নিয়ে স্তুপ করে, তাতে আগুন ধরালাম। শিশিরে ভেজা নাড়া জ্বলতে কি চায়। যাক ধরেছে, এবার দুহাত ঘঁষে একটু গরম করে নেয়া। না ঠিক হচ্ছে না। হাত বাড়ালাম, আগুনে সেঁকে নিলাম দুহাত। কিছুটা আঁধার কেটে গিয়ে আলো ফুটছে। আগুন দেখে দু-চারজন চাষি কোদাল, কাস্তে হাতে বসে পড়ল আগুন পোহাতে। আর তাদের জ্বলন্ত উদার বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছিল, যদি এই সময় মিলতো গরম গরম ভাপাপিঠা কিংবা কাচিখোঁচা পিঠার সঙ্গে ভিড়গুড়, এসব নিয়ে জমলো কত আলাপ-হাসিতামাসা।

চোখ পড়লো গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রসের হাড়ি পেড়ে কাঁধে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যারা সন্ধ্যায় কঠোর পরিশ্রম করে গাছ কেটে পেতেছে হাড়ি, তাতে বিন্দু বিন্দু রসে পরিপূর্ণ হাড়ির কাঁচা মিষ্টি রসের গন্ধ মন কাড়ে।

মনে পড়ে ছোট বেলায় শোনা দিদার মুখের মিষ্টি গান। মনে পড়ে বাড়ির উঠোনে ইট দিয়ে বড়চুলা তৈরি করে তাতে তাফাল বসিয়ে নাড়ার আগুন জ্বেলে তৈরি হতো নলেন আর ভিড়গুড়। মা- মাসিরা সেই গুড় তুলে হাড়িতে রেখে, সেই বড় তাফালে লেগে থাকা গুড়ে মুড়ি ঢেলে দিয়ে তাতে কাঠি দিয়ে নেড়ে তৈরি করতো বড় বড় মোয়া। রসের মিষ্টি গন্ধে কড়মড় করে সেই মোয়া চিবোতে কি যে মজা! যা না খেলে, তাকে বোঝানো সম্ভব না। ঠাকুমারা আগে থেকে তিল ঘঁষে চাল ভেজে রাথতেন। গুড় জ্বাল দেয়া শেষ হলে ভাজাচাল আর তিল দিয়ে বানাতেন তিলচালের মোয়া/ নাড়ু। আহা কি স্বাদ! যা আজও মুখে লেগে আছে। এতোক্ষণ এইসব স্মৃতি মনে করতে করতেই যেন পেটের পিলেগুলি ছোটাছুটি করছে এবং আরও কিছু খুঁজছে।

আরও মনে পড়ছে সেই সুদূর দিনের কথা, শীতের ভোরে কাঁপতে কাঁপতে শাড়ির আঁচল গায়ে জড়িয়ে গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতেই বৌ-ঝি মা-মাসি সবাই মিলে খড়কুটো দিয়ে বড় বড় দো-চুলা তাতে একপাশে ভাজতেন ভাপাপিঠা অন্যপাশে কাচিখোঁচা পিঠা, যাকে কেই কেই বলেন চিতই পিঠা। ভিড়গুড় লাগিয়ে গরম গরম চিতই পিঠা খেতে বেশ লাগে। আর পাটালিগুড় নারকেল দিয়ে গরম ভাপাপিঠা খাওয়ার আনন্দ কি ভোলা যায়।

আজকাল গ্রামেও এইসব আর হয় না, প্রায় সকল বাড়ির লোকজন এখন শহরমুখি। কেই হয়তো চাকরি করে, কেউ বা ছোটখান ব্যবসা করে আল্প আয়ে রেজগারে বেশ চলছে। তাই প্রামেই এই দৃশ্য এখন বিরল। এসব এখন কল্পনা করা ছাড়া গতি কি? ওই গরম গরম কাচিখোঁচা কিংবা চিতই পিঠা ভেজে খেুজুরের গুড় আর গাইয়ের দুধে জ্বাল দিলে, তার সেই যে সুগন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত, পাশের বাড়ি থেকে পিঠা রান্নার গন্ধে আত্মিয়ের হাঁকডাক পড়তো, তা শুনে আমাদের মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে যেত।

পিঠা বানানোর কাজ করতে করতে মায়ের হাতের শাঁখা-পলা আর সোনার দুগাছা চুড়ির টুংটাং শব্দ, আর মা’র মুখের সেই মিষ্টি হাসি দেখতে আমাদের বেম ভাল লাগতো। গরম গরম দুধচিতই, খেজুর রসের সেই গন্ধ, খোলা থেকে তুলে তপ্ত পিঠা খাওয়ার কি যে মজা! কি যে স্বাদ!! তাতো বলার নয়, ভোলাও সম্ভব না। আজও সেইসব মনে পড়লেই ইচ্ছে হয় আবার খাই, আরও খাই। আর একটু পাতে তুলে নেই। এমনি রস জ্বালানো সুগন্ধ আজও বাংলার বাতাসে ধোঁয়য় মিশে আছে। মনে পড়ছে মাঝরাতে রসের পায়েস খাওয়ার কথাও…গ্রামের বন্ধুরা কয়েকজনে রস চুরি করে মাঠের খড়কুটো পুড়িয়ে সেই রস জ্বাল দেয়া হতো। সেই রসের মধ্যে কাটারিভোগ বা আতপ চাউল দিয়ে সুমিষ্ট পায়েস রান্না করে, বন্ধুরা একসঙ্গে মিলে কলার পাতায় পাত পেতে পায়েস খাওয়ার সে যে কি আনন্দ, কি যে মজা!

আহ্… এ কথা মনে পড়লেই হৃদয়-মন ছুটে যায়, আমাদের গ্রাম বাংলায়। তাই, গ্রামের কুলবধূর আঁচলে শিউলি ফুলের গন্ধ ভরা মায়ের ছলছল চোখের উজ্জ্বল আলো আর তার মিষ্টি হাসির পিঠা-পায়েস আজ যেন সবটাই জমে খির।

এমনি অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে, হঠাৎ চোখ খুলে দেখি, সাথিরা যে-যার কাজে চলে গেছে। কখন যে নাড়ার আগুন নিভে ছাঁই হয়ে পড়ে আছে। মাথার উপর সূর্য তাপ দিচ্ছে, সেই উঞ্চতায় কপালে বিন্দু বিন্দু জল জমেছে। হায়, মা তো সেই কবে চলে গেছে। বধু ও-তো নেই আজ আর। সবাই বড্ড আভিমানী যেন ফুটন্ত রসের মিষ্টি গন্ধের মতো ফুরফুরে রসের বাস্প হয়ে সবাই পাড়ি দিয়েছে অন্যত্র। এরপর একে একে কতদিন পেরিয়ে গেলো।সেই পরিপাটি জীবন আর কাটাতে পারছি না। পাই না সেই টগবগে ফুটন্ত ভালোবাসা। এখন কাছে ডেকে ঠোঁটে তোলে না কেউ রসের পায়েস, মুখে পুরে দেয় না দুধচিতই, পরিবারে সবাই সব ভুলে গেছে, রসে দুধে ভেজানো সব কিছুই। আমিও যেন কতদিন খাই না। আজ বার বার মনে হচ্ছে সেই পুরনো ইতিহাস, পুরনো স্মৃতি। আজ বড্ড দুধচিতই আর রসের পায়েস খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কি করে খাবো এসব? এতো অনেক পরিশ্রমের এবং দুর্লভ জিনিস,কোথায় পব?

দেখা যাক, এবার উঠি, হঠাৎ হাতে এল একথালা রসের পায়েস। আজ নাকি বাড়িতে তৈরি করা হয়েছে। এই নাও মা পাঠিয়েছে, খেয়ে কিন্তু বলবে, কেমন হয়েছে। আহা, কি মিষ্টি কণ্ঠ নরম সুরে রসের গন্ধের মতো তার কথা শুনে মন ভরে গেল। আর আমি তখন তৃপ্তি সহকরে খেলাম রসের পায়েস। দুপুরের স্নান-আহার সেরে দাওয়ায় বসে পানেরবাটা নাড়তে নাড়তে শুনতে পেলাম, নাতবৌ বলছে, আজ তোমাকে রসের গুড়ের পিঠা খাওয়াবো। এ কথা শুনে, আমার মনের কোণে আর একটিবার উঁকি দিল, আবার মনে করিয়ে দিল, পুরনো স্মৃতি, পুরনো অনেক ইতিহাস, কতো কথা…।

তবুও এই কনকনে শীতেকালে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যের খেজুর রসের পিঠা-পায়েস এর কি যে বাহারী স্বাদ, কি আনন্দ, কি মজা…।

লেখক : স্কুল শিক্ষক ও কবি
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
মার্চ ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১