সংবাদ শিরোনাম :
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলার দায়ে নানকের ভিসা বাতিল?   ⏺️  কমিশনার-ডিসিদের রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ কেন অবৈধ নয়: হাইকোর্ট   ⏺️  রাঙ্গাবালীতে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৫ জন আসামি, গ্রেফতার ২০   ⏺️  ভোটাররা যদি কেন্দ্রে যেতে না পারেন সেজন্য সরকার দায়ী থাকবে   ⏺️  নির্বাচন কমিশন ব্যথিত-বিব্রত: সিইসি   ⏺️  মোহাম্মদ জসিম-এর পাঁচটি কবিতা   ⏺️  নিখোঁজের তিন দিন পর মেহেন্দিগঞ্জের ওষুধ ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার   ⏺️  নোয়াখালীতে যুবলীগ নেতাকে গুলি করে খুন   ⏺️  চলচ্চিত্রকার খিজির হায়াৎ হত্যার পরিকল্পনাকারী দুই জঙ্গি রিমান্ডে   ⏺️  তুরস্কে পুলিশ বিভাগে গোলাগুলি, রাজ্য পুলিশপ্রধান নিহত

‘বরিশালের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার কথা বলছি’


শাকিব বিপ্লব  || বরিশালট্রিবিউন.কম ||   প্রকাশিত:  নভেম্বর ২৩, ২০১৮


অগ্রজ সাংবাদিক মুরাদ আহম্মেদ ভাইয়ের ফেসবুক আইডিতে তার একটি স্ট্যাটাস পড়ে ক’দিন ধরে আমার মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। মন্তব্যটা এমনই “তিনি যদি ভুলে ভরা কিছু লিখতেন তাই সারাদিন পড়তেন। অন্যের লেখা পড়তেন না।” তার এই মন্তব্যের তরজমা কি সেটা হয়তো তিনিই জানেন। তবে অনুমান করছি, বরিশালের হাল সময়ের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা নিয়ে হয়তো মনের আক্ষেপ থেকে এই মন্তব্য লিখে কিছুটা ক্রোধ প্রকাশ করেছেন। যদি তাই হয় এক্ষেত্রে আমিও সহমত পোষণ করছি। মুরাদ ভাইকে নব্বই দশক থেকে চিনতে-জানতে শুরু করি। সর্বদা চলন-বলনে স্মার্ট এই মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সাথে আমার গভীর সখ্যতা না থাকলেও উভয়ের মধ্যে বড় ভাই-ছোট ভাই সম্পর্কের আদলে প্রায় দেখা-সাক্ষাত হয়। তার মধ্যে সৌজন্যতার অভাব দেখিনাই।

যশোরে অবস্থানকালিন ওভার টেলিফোনে তার সাথে কথা হত সংবাদ নিয়ে। তখন তিনি প্রভাবশালী আঞ্চলিক দৈনিক আজকের বার্তার সম্ভবত বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার বরিশাল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। আমি যশোর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ওই পত্রিকায় বিশেষ কিছু প্রতিবেদন ফ্যাক্সযোগে পাঠিয়ে টেলিফোন করামাত্র তিনি রিসিভ করে প্রেরিত সংবাদের ভুল-ত্রুটি শুধরে দিতেন। আবার কখনো কখনো গাইড লাইনও শুনাতেন। তখন মুরাদ ভাই বরিশাল সংবাদপত্রে দারুণ দাপটীয় যুগ পার করছিলেন। কিন্তু সেই মুরাদ ভাই আর আজকের মুরাদ ভাই অনেক ভিন্ন। বর্তমানে তিনি প্রভাবশালী ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের বরিশাল অফিস প্রধান হিসেবে কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চললেও পূর্বেকার ন্যায় সাংবাদিকদের সাথে অতটা মিশতে দেখি না। প্রেসক্লাব রাজনীতি থেকেও নিজেকে দুরত্বে রেখেছেন।

স্বগোত্র সহকর্মিদের সাথে মিশবেন কিভাবে? সেই পরিবেশ কি আছে? এখন সিনিয়রদের জুনিয়ররা সম্মান করে না। কিছু শেখার জন্য তাদের দ্বারস্তও হয় না। বরং ভাবখানি এমনই যেন সিনিয়ারদের থেকে নবীনরা যেন বেশি জানে-শোনে। এ কারণে সিনিয়র সাংবাদিকরা এখন জুনিয়র সহকর্মীদের দেখলে অনেকটা এড়িয়ে চলতে দেখা যায়, শোনা যায়। ভাগ্য ভালো মুরাদ ভাই এখনো ভালো একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। যদি তিনি বেকার থাকতেন তাহলে হয়তোবা তাকে কেউ দেখলেও সালাম দেয়া তো দূরের কথা কুশল বিনিময় করতেন কিনা আমার সন্দেহ রয়েছে। কারণ বরিশাল মিডিয়া এমনই এক জায়গা যাকে বিচিত্র ভূবন বললে অতিরিক্ত হবে না। এখানে গুণীদের কদর নেই। মেধাবী অপেক্ষা চাটুকরদের জয়জয়কার অবস্থা। আর যদি মিডিয়া মোড়লদের তোষামদি করা যায় তাহলে দিন কাটবে ভালো। ডাক পাওয়া যায় বিভিন্ন মহল থেকে।

বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতারা তো এ সকল সাংবাদিকদের জামাই আদর করেন। প্রশাসনও কম কিসের? মাঝে মধ্যে বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে গিয়ে দেখা যায় লেখালেখির মুরদ নেই। এমনকি নিজের পত্রিকার নামটি ভালো করে লিখতে পারে কিনা সন্দেহ আছে, সেই সংবাদকর্মীরাই স্যারের টেবিলের সামনে খোসগল্পে মসগুল থাকেন। শোনা যায়, স্যারদের বদৌলতে কেউ কেউ এখন বিত্তবান। প্রশ্ন জাগে, কোন যোগ্যতায় তাদের এত কদর? উত্তরও সহজে পাওয়া যায়। স্যারদের অনেক কাজকর্ম তারা সহসায় সম্পাদন করে এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়েছেন যে অনেক সময় সিনিয়র সাংবাদিকরা এই স্যারদের সাথে দেখা করতে গিয়ে কক্ষে ঢুকতেই পারেন না। কারণ স্যারের সামনে বসে আছেন “বড় স্যার” সাংবাদিক।

এভাবে আর ক’দিন চলবে কে জানে। তবে যা দেখা যায় তাতে আগামী দিন আরো মনে হয় ভয়াবহ পরিস্থিতির আবর্তে ঘুরপাক খাবে বরিশাল মিডিয়া। যেভাবে একের পর এক পত্রিকা জন্ম দিচ্ছেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আর তা প্রস্ফূটিত হতে রাজনৈতিক নেতারা যেভাবে ফূ-ফা দিচ্ছেন তাতে পাঠক নয় তাদের মূখপত্র হিসেবেই এখন পত্রিকাগুলো বেশিমাত্রায় ভূমিকা রাখতে বাধ্য হচ্ছে। আঞ্চলিক পত্রিকার সংখ্যা চল্লিশের কোটা ছাড়িয়েছে। এ সংখ্যা আরো হয়তো বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে কয়টি পত্রিকা পাঠক প্রিয়? পত্রিকা অফিসগুলোতে ঢুকলে দেখা যায় দুটি বা একটি কম্পিউটার, আছে দু’জন কম্পিউটারম্যান। এদের মধ্যে একজন বার্তা সম্পাদক। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে এখন বার্তা সম্পাদকরাই কম্পিউটার চেপে পত্রিকার ডিজাইন করতে বাধ্য হচ্ছেন। রিপোর্টারের খোঁজ নেই। কেন, অনলাইন পত্রিকা আছে না? সন্ধ্যার পরই শুরু হয় অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদ খোঁজাখুঁজি। সেই সংবাদ কপি করে সাজানো হয় পত্রিকা।

বিদায়ী জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান সাহেব একটি সেমিনারে তো বলেই ফেললেন, বরিশালের পত্রিকা আর কি পড়বো। একই নিউজ থাকে সব পত্রিকায়। মজার একটি উদাহরণ দিলে বললেন একজন স্বনামধন্য ব্যক্তির স্ত্রী মারা গেছেন। একটি অনলাইন পত্রিকায় সেই শোক সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে মৃত ব্যক্তির সন্তানদের সংখ্যার জায়গায় লেখা হয়েছে তিনজন স্বামী রেখে গেছেন। কম্পিউটার কম্পোজে ভুলগত সেই সংবাদ স্থানীয় পত্রিকাগুলোর অধিকাংশ হুবহু প্রকাশ করায় পাঠক মহলে হাস্য-রহস্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একজন মৃত ব্যক্তি তিনজন স্বামী রেখে গেলেন কিভাবে? এই প্রশ্ন তুলেছেন পাঠক মহল। এমনকি জেলা প্রশাসক মহোদয়ও সেই সংবাদ পড়ে হতবাক। ফলশ্রুতিতে তিনি বললেন বরিশাল মিডিয়ার হাল-দশা কি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কথাতো সত্যি। পত্রিকা বেড়েছে অনেক। রাস্তা-ঘাটে রিপোর্টারও দেখা যায় অনেক। কিন্তু ক’জন পত্রিকা সংশ্লিষ্ট এবং দক্ষ সে প্রশ্নতো রয়েছেই। এ কারণে ভুলে ভরা মানহীন পত্রিকা নিয়ে সমালোচনা কম নয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। এ ক্ষেত্রে যেমন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারী নেই। তদ্রুপ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের কণ্ঠে আওয়াজ নেই। যেন যগাখিচুরী অবস্থা।

পাঠক বা বন্ধুরা, একজন সংবাদ কর্মি হয়ে এ কথা বলে হয়তো আমি স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছি বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু না। বাস্তবতা বলছি ক্ষোভের জ্বালায়। কারণ একটি পত্রিকা তৈরী করতে গেলে যেখানে দক্ষ লোকের প্রয়োজন, সেখানে অদক্ষদের সমাহার। মালিক বা সম্পাদক যারা হচ্ছেন তাদের নিজেদেরই তো পত্রিকা সম্পর্কে কোন ধ্যান-জ্ঞান নেই। পত্রিকার সংবাদকর্মী বাছাই করার বদলে কে পারবে তোয়াজ করতে সেই গুণীজনকেই ডাক দেন। বসিয়ে দেন বার্তা সম্পাদক বা নির্বাহী সম্পাদকের চেয়ারে। নিজে বসেন এসি রুমে। বরিশালে এটাই আঞ্চলিক পত্রিকার এখন ট্রেডিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পত্রিকার মালিক-সম্পাদক হলেই অনেক কিছু করা সম্ভব। ঢাল তো বটেই, রাজনৈতিক মহল আর প্রশাসনিক দপ্তরে কদর পাওয়া যায়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের একদিনে তিনটি ছবি ছেপে অথবা গুণকীর্তন গেয়ে প্রকাশিত সংবাদ সংশ্লিষ্ট পত্রিকা কাক ডাকা ভোরেই পৌঁছে দেন তাদের বাড়ি বা দপ্তরে। এরপর স্ব উদ্যোগে টেলিফোনে বলেন, ভাইজান সংবাদটি কেমন হল? উত্তর- দারুণ। একই কায়দা প্রশাসনিক দপ্তরের শীর্ষ কর্তাদের ক্ষেত্রেও। সুতরাং পত্রিকা হলে গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়া যায় বরিশালে। এখন পাঠক পত্রিকা চেনে না। চেনে শুধু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিরাই। শুধু কি পত্রিকার এই হাল? সাংবাদিক নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সহকর্মিরাই মানে না সাংবাদিক নেতৃবৃন্দদের। বরং দেখা যায় ঘটনা চক্রে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দদেরও সহযোগী পত্রিকায় তুলোধুনো করে। অর্থাৎ কাকের মাংস কাকে খায়। পাঠক ও সাধারণ মানুষও বুঝে ফেলেছে বরিশাল মিডিয়ার দুর্বলতা কোথায়। সম্ভবত যে কারনে এখন আর সংবাদ কর্মিদের কদর নেই। বরং সাংবাদিক শুনলেই এড়িয়ে চলেন। এভাবে আর কতদিন চলবে আল্লাহই জানে। এখন একটি সিডর দরকার। যদি ঝড়ো বাতাসে বরিশাল মিডিয়ার পরিবর্তন আসে। নচেৎ আগামী দিনে পত্রিকা আর সাংবাদিকের নাম শুনলে দৌঁড়ে পালানোর দৃশ্য দেখা যেতে পারে।

এ লজ্জা কার?