সংবাদ শিরোনাম :

ভোটের হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে, উছলে পড়ে আলো


মাসকাওয়াথ আহসান  || বরিশালট্রিবিউন.কম ||   প্রকাশিত:  ডিসেম্বর ৪, ২০১৮


কোত্থেকে দৌড়ে এসে এক সফেদ পাঞ্জাবি পুরুষ জড়িয়ে ধরে সবজিওয়ালাকে। সফেদ পাঞ্জাবির ভেতর থেকে থলথলে চর্বিগুলো ইতস্তত বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন। লোকটার রোমশ বুকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঘাসের ডগায় শিশিরের মতো চিক চিক করছে। মুখময় দন্ত বিকশিত হাসি।

সবজিওয়ালা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বেচাবিক্রি নাই ভাই; অহন টেকা দিমু কোত্থিকা!

পাঞ্জাবি পুরুষ সবজিওয়ালার মুখ চেপে ধরে বলে, ওইসব ছোট খাট কাম কবেই বাদ দিছি; এইবার এমপি ইলেকশনের মনোনয়ন পত্র কিনছি। আগে যা হইছে, ফরগেট দ্য পাস্ট। দোয়া গো। দস্যু নিজাম পরে আউলিয়া হইতে পারলে; আমিও পারবো ইনশাল্লাহ। রাজনীতি হচ্ছে ইবাদত।

পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা পাঁচ হাজার টাকার চকচকে নোট বের করে সবজিওয়ালার পকেটে গুঁজে দেয় পাঞ্জাবি পুরুষ।

পাঞ্জাবি পুরুষ বিদায় হতেই আরেক সফেদ টুপি পুরুষ এসে বিরাট সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরে সবজিওয়ালাকে। সবজিওয়ালা নিজেকে জাপটা-জাপটি মুক্ত করতে করতে বলে, আপনের পার্টির পাঞ্জাবিওয়ালা তো দোয়া নিয়া গেলো গা; অহন আবার আপনে কী চান!

টুপি পুরুষ নুরানি হাসি দিয়ে সবজিওয়ালার হাত টিপতে টিপতে বলে, ঐ জনাব এই আসনে মনোনয়ন পাবেন না; আমার মনোনয়ন আল্লাহর রাহে সুনিশ্চিত। বলেন মাশাল্লা। যে কোন প্রয়োজনে আমাকে বলবেন মুমিন ভাই; এই বান্দা আপনার খেদমতে হাজির হবে।

পকেট থেকে খুরমা-খেজুরে জড়ানো কিছু টাকা বের করে সবজিওয়ালার হাতে দিয়ে টুপি-পুরুষ বলে, মোটা অংকের ভালোবাসা পাইছি আপনাগো দোয়ায়; সেই ভালোবাসা বিতরণ আমার ইমানী দায়িত্ব। বলেন, সুবাহানআল্লাহ।

সবজিওয়ালা মনে মনে ভাবে, আইজ দেখতেছি সবজি বেচার চেয়ে ভোট বেচাতেই বেশি আমদানি হইতেছে।

শরিফার মা সকাল সকাল উঠে পান্তা ভাতের ডেকচি নিয়ে বসে ছেলে-মেয়েকে ডাকছিলো। এমন সময় বাইরে থেকে ডাক আসে, শরিফার মা আছেননি!

শরিফার মা বাইরে বের হয়ে দেখে এক মহিলা ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়ে। সে এগিয়ে এসে শরিফার মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, বুবুগো, রাইতে আপনেরে স্বপ্নে দেখলাম। তাই ঢাকা থেকে ডাইরেক্ট চলে এলাম আপনের লগে পান্তা খাইতে।

শরিফার মা শশব্যস্ত হয়ে পড়ে। গরিবের বাড়িতে হাতির পাড়া।

–আপনেরে কী দিয়া যে আপ্যায়ন করি; আমরা গরিব মানুষ।

–কইলাম না পান্তা খামু।

শরিফা ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে চমকে ওঠে। ছোট ভাইকে ঘুম থেকে তোলে।

–অই এনাম ওঠ; দেখ কেডায় আইছে।

বারান্দায় খেজুর পাতার পাটিতে বসে পেয়াজে কামড় দিয়ে এক গাল পান্তা খেতে খেতে ঘোমটাওয়ালি আসল কথাটা পাড়ে।

–বুবু আমি মনোনয়নপত্র কিনছি; আপনে দোয়া দিলে এমপি হমু। আপনারে স্বপ্ন দেখছি। আপনি দোয়া দিলে অবশ্যই হবে।

শরিফার মা জীবনে প্রথম নিজের গুরুত্ব অনুভব করে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে।

–আপনারে ইমান দিলাম আফা; আপনার ভোটের ক্যানভাস করুম। এই পাড়ার সব ভোট আপনি পাইবেন।

ঘোমটাওয়ালি ঘোমটার ভেতর থেকে খ্যামটা দিয়ে টাকার মোটা বান্ডিল বের করে শরিফার মা’কে দেয়। এইগুলি বিরতণের দায়িত্ব আপনার।

জোর করে টাকা গুঁজে দেয় শরিফা আর এনাম দুজনের হাতে।

–তোমরা মিষ্টি খাইবা আর মায়েরে মিষ্টি বিতরণে হেল্প করবা কিমুন।

ওরা দুজন হতভম্ব হয়ে মাথা নাড়ে। ঘোমটাওয়ালি বিরাট এক প্রাডো হাঁকিয়ে ফিরে যায়; একটি অত বড় গাড়ি শরিফার মায়ের বাড়ির সামনে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায়; ওপাড়ায় শরিফার মা ঘোমটাওয়ালির স্বপ্নে দেখা দেয়ার ফজিলতে আচম্বিতে ভিআইপি হয়ে ওঠে। আনন্দ আর হাসির ফোয়ারা আছড়ে পড়ে তাদের বাড়ির নিকানো উঠানে; বকুলতলায়; কবুতরের খোপে; সবখানে।

ভোটের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো।
ও মনোনয়নগন্ধা, তোমার এমপিসুধা ঢালো॥
পাগল হাওয়া বুঝতে নারে ডাক পড়েছে কোথায় তারে–
ভোটার বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো॥

এই লেখার বিষয়বস্তুর সত্যতা কাকতালীয়। পাঠকদের বিনোদনের জন্য earki.com থেকে কপি করে হুবহু তুলে দেওয়া হল