২৪শে মে, ২০১৯ ইং, শুক্রবার

মেয়রের অফিসে বাইশ মিনিট

আপডেট: মে ৭, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

আলম রায়হান : বরিশালের মেয়র সাদিক আবদুল্লার অফিসে ছিলাম প্রায় বাইশ মিনিট, গতকাল সোমবার দুপুরের দিকে। বরিশালের নগর পিতার সঙ্গে নগর ভবনে আমার দেখা করার এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এ সময় স্বভাবগত এবং পেশাগত কারণে নানান দিকে খেয়াল করেছি। অনেক কিছু দেখেছি এবং শুনেছি অনেক কথা। নগর ভবন থেকে বের হয়ে রেস্ট হাউজে যেতে যেতে ভাবলাম, চারদিকে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক নানান জটিলতার পরও সঠিক লোক বাছাই করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব।

সকলেরই জানা, ক্ষমতা আসলে চেয়ারের। কিন্তু চেয়ারে যিনি বসেন তার উপরও নির্ভর করে অনেক কিছু। এজন্যই বলা হয়, ম্যান বিহাইন্ড মেশিন অনেক ম্যাটার করে। যার অসংখ্য ঘটনা আমি জানি। এর সঙ্গে আর একটি যোগ হলো গতকাল। যে বিষয়ে কিছুটা হলেও পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে আমার। এ অভিজ্ঞতায় অরো কিছু যোগ হলো কাল, ঘটনাচক্রে। একাধিক দফায় মেয়র আহসান হাবিব কামাল, মজিবুর রহমান সরোয়ার, শওকত হোসেন হিরণ থেকে শুরু করে বিসিসি’র বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক অবদুল্লাহকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি; রাজনৈতিকভাবে চিনি পেশাগত বাধ্যবাধকতায়।

বরিশাল শহরে খবরের সন্ধানে এখানে-সেখানে ‘হাজিরার’ পর দুপুর নাগাদ ঢুকলাম নগর ভবনে। নিয়ম-নীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে প্রবেশ করি মেয়রের কক্ষে। তখন মেয়রের কক্ষে কয়েকটি ছবি সেট করার কাজ চলছিলো। প্রথম দফায় লক্ষ করলাম, প্রতিটি বিষয়ে মেয়রের নজর কতটা সূক্ষ্ম।

দ্বিতীয় দফায় ঘটলো সবচেয়ে মজার বিষয়। একজন প্রকৌশল কর্মকর্তা মেয়রকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে একটি বিষয় জানাতে চাইলেন, আদেশ প্রার্থনা করার মতো। যেনো বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি ছিলো আদলা ইট রাখা সংক্রান্ত। মেয়র বললেন, “আদলা ইট কোথায় রাখবেন তাও আমাকে বলতে হবে! আপনারা কেন এইসব তুচ্ছ বিষয়ে আমাকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন!” মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর কথায় নাজিউর রহমান মঞ্জুরের একটি ঘটনা মনে পড়লো আমার। এটি তার কাছেই শুনেছি।

ঘটনাটি এ রকম। নাজিউর রহমান মঞ্জুর সেসময় এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে প্রথম সচিব পেয়েছেন আবু হেনাকে, ডাক সাইটে সিএসপি অফিসার। পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন। মন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় পর্বে সচিব ‘স্মার্ট বিনয়ের’ সঙ্গে বললেন, “স্যার আপনার মেট্রিক কোন ইয়ারে?” নাজিউর রহমান ইয়ার জানালেন। সচিব বললেন, “তখন আমি বরিশালের ডিসি ছিলাম।” ভোলার বালিয়ার জমিদার পরিবারের সন্তান নাজিউর রহমান বুঝলেন সচিব তাকে ম্যাসেজ দেবার চেষ্টা করছেন, “আরে বালক এখন মন্ত্রী হলে কি হবে, তুমি যখন মেট্রিক পাস করো তখন আমি তোমার জেলার দন্ডমুন্ডের কর্তা ছিলাম!”

নাজিউর রহমান সতর্ক হলেন। এবং আধা ঘন্টার মধ্যেই তার সন্দেহের প্রমান মিললো। সচিবের দপ্তর থেকে দুই পিয়ন প্রায় একশ’ ফাইল নিয়ে এলো মন্ত্রীর বিবেচনার জন্য। নাজিউর রহমান কয়েকটি ফাইল উল্টে দেখলেন, সবই অতি সাধারণ বিষয়ের; যেগুলো উপ-সচিব পর্যায়ে ডিসপোজাল হবার কথা। নাজিউর রহমান মঞ্জুর বুঝলেন, সচিব লেজে খেলার তালে আছেন। মন্ত্রী সকল ফাইল মিলিয়ে নোট লিখে দিলেন, “আমি দলিল লেখক নই, এ ধরনের ফাইল উপ-সচিব পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে। মন্ত্রীর দফতরে আসবে কেবল নীতি নির্ধারণী ফাইল।” ব্যাস, শৃগালের মত ধূর্ত সচিব ম্যাসেজ পেয়েছিলেন। উল্লেখ্য, এই নাজিউর রহমান মঞ্জুরকে একই সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং ঢাকার মেয়রের দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ।

জেনারেল এরশাদের অনেক সীমাবদ্ধতার কথা বলা যায়। কিন্তু চরম নিন্দুকরাও স্বীকার করবেন, উপযুক্ত লোক বাছাই করার ক্ষেত্রে এরশাদ বেশ দক্ষ ছিলেন। এদিকে সার্বজনীনভাবে প্রমানিত সত্য, নিজে কাজ করা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে কাজের লোক বসাবার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনন্য। আর সকলেই জানেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছেন বলেই সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বরিশালের মেয়র নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছেন। নানান ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সাদিক আবদুল্লাহর মেয়র হওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে কতটা তৃপ্ত করেছে তা শপথ অনুষ্ঠানের ছবির দিকে খেয়াল করলেই যে কেউ বুঝবেন। এ ছবিটি বিসিসি ভবনের মেয়রের কক্ষে সংরক্ষিত আছে। আরো গুরুত্বপূর্ন ছবি গতকাল মেয়রের কক্ষে স্থাপন করা হয়েছে। যা বাংলাদেশ ও বরিশালের ইতিহাস ফুটিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। এ এক সুখবর।

বরিশালবাসীর জন্য আরো একটি সুখবর হচ্ছে, যানজট নিরসনের জন্য সদর রোডে টেকসই ডিভাইডার বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি এমনভাবে করা হবে যাতে প্রয়োজনে সড়িয়ে নেয়া যায়। কিন্তু এতে ছিলো বড় ত্রুটি। যা নজরে পড়ে মেয়রের। শুধু নজরে পড়া নয় তিনি সমাধানও দিলেন। তার সঙ্গে একমত পোষণ করলেন সকল ইঞ্জিনিয়ার। আমি ভাবলাম, রাজধানীতে ওভারব্রিজের নকসা প্রধান মন্ত্রীকে সংশোধন করতে হয়; বরিশাল নগরীর রোড-ডিভাইডারের ত্রুটি সংশোধন করতে হয় মেয়র সাদিককে। কিন্তু এসব আগে কেন বোঝেন না ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরা!

নগরের সুবিধা নিয়ে কেবল নয়, সমালোচনার বিষয় নিয়েও ভাবেন মেয়র সাদিক। তার বিরুদ্ধে সর্বশেষ প্রচারণা ছিলো, তিনি নিয়মিত অফিস করেন না। কিন্তু ’৭৫-এর থিংকট্যাঙ্কের সর্বশেষ প্রচারণার সুযোগও আর রাখলেন না মেয়র সাদিক। তিনি এখন নিয়মিত অফিস করছেন। গতকাল অফিসে প্রবেশ করেছেন সকাল আটটায়। ফলে আগে যারা প্রচার করতেন, মেয়র নিয়মিত অফিস করেন না তারা পড়েছেন বিপাকে। এদের মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রয়েছেন।

রোড ডিভাইডারের নকশায় ত্রুটি চিহ্নিত করা কেবল নয়, পানির লাইনের ত্রুটিও চিহ্নিত করেছেন মেয়র সাদিক। তিনি জানালেন, ড্রেনের মধ্য দিয়ে পানির লাইন গেছে। যা যাবার কথা নয়। আবার পাইপও হচ্ছে নিম্নমানের। ফলে পানি কেবল দুষিত হওয়া নয়, পানির লাইনে ভাতও পাওয়া যায়!
গতকাল সোমবার মেয়র সাদিক সবচেয়ে মহান একটি কাজ করেছেন। তা হচ্ছে এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে চাকুরি দেয়া। বীর এই মুক্তিযোদ্ধার জীবন চলে রিকসা চালিয়ে। কিন্তু এ নিয়ে তার কোন ক্ষেদ নেই। বরং তার তৃপ্তি হচ্ছে রিকসায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকে বহন করার স্মৃতি। তিনি তাদের নামও বলেছেন তোতা পাখির মতো। তবে তার ছেলেকে চাকুরি দেবার দায়িত্ব নিতে হলো মেয়র সাদিককে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়ে মেয়র বলেন, “আমি আমার সিদ্ধান্ত দিয়েছি, এখন নিয়ম মেনে কিভাবে করবেন সেটি আপনার দায়িত্ব।”

এ ব্যাপারে সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের, একটি ঘটনা দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। ঘটনাটি এ রকম। মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম তার দলের এক কর্মীকে চাকুরী দিতে বলেছিলেন। কিছু দিন পর সচিব জানালো, “স্যার আপনার ক্যান্ডিডেটতো একশতে নয় পেয়েছে। মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম বললেন, এই নয়কেই নব্বই বানিয়ে ফেলেন, তা না হলে কিসের সচিব আপনি।” অই ঘটনার সময়ও ঘটনা চক্রে আমি মন্ত্রীর রুমে ছিলাম। গতকাল একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মেয়র যখন চাকুরী দিতে বললেন তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মনোভাবের পরিচয় পেয়ে আমার মনে পড়লো মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের মন্ত্রণালয়ের সচিবের কথা। আমি বুঝি না, সরকারী কর্মকর্তারা জন-প্রতিনিধিদেরকে কী ভাবেন!

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
মে ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« এপ্রিল    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
Website Design and Developed By Engineer BD Network