২০শে মে, ২০১৯ ইং, সোমবার

রাত্রিশেষ -এর কবি আহসান হাবীবের জন্মদিন আজ

আপডেট: জানুয়ারি ২, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

রাতের পাহাড় থেকে
খ’সে যাওয়া পাথরের মত
অন্ধকার ধসে ধসে পড়ছে।
এখানে এই বিশাল পথ জড়িয়ে
অন্ধকার প’ড়ে আছে
দীর্ঘকায় সাপের মত।
তার দেহে লাগলো মৃত্যুর মোচড়।
নদীর জলে ঝলকে উঠবে মুক্তি,
কেননা
এদিকে আবার জাগবে নতুন সূর্য

[রেড রোডে রাত্রিশেষ]

এক কথায় ‘রাত্রিশেষ’ (১৯৪৭) অস্তিত্ব-প্রকাশের সংগ্রামশোভিত উদ্ভাসন। কার অস্তিত্ব কার সংগ্রাম, কার রাত্রি- ইত্যাকার জিজ্ঞাসাগুলো অনন্তর বলয়িত হয়। এর সহজ উত্তর : আত্ম প্রকাশের এ বাসনা এবং সাধনা ব্যক্তিমানুষের যেমন, তেমনি সমাজেরও। এ সংগ্রাম ব্যষ্টির তেমনি সমষ্টির। এই রাত্রি একার এবং অনেকের।

এই রাত্রি নির্ঘুম অন্ধকারে দীর্ঘকাল জেগে থাকার। জাগ্রত চৈতন্যের স্বপ্নবুনন আর সংগ্রামী পদক্ষেপ রচনার ইতিহাস এই রাত্রি। এই ইতিহাস আত্মগত ‘আমি’র, এই ইতিহাস তদগত ‘আমরা’র অন্ধকারের কেন্দ্র থেকে এভাবেই উৎসারিত হয়েছেন আলোকিত আহসান হাবীব।

২.
পিতা চেয়েছিলেন তিনি যেন হাকিম হন। কিন্তু তার অন্তর্লোক থেকে যেন হুকুম এলো- ‘না, তুমি কবি হও।’ কবিদের হয়ে ওঠার গল্পগুলো বোধ হয় এ রকমই!

স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখির শুরু। কেউ কেউ পড়েছেন, কেউ কেউ সন্দেহও পোষণ করেছেন- ‘না, এ লেখাগুলো তোমার হতে পারে না; তুমি নকল করেছ।’ এতেই প্রতীয়মান, লেখাগুলোর মান কেমন ছিল।

কবি তো জনতেন, লেখাগুলো তারই রচনা। তাই, প্রত্যয়ঘন উৎসাহে মেতে উঠাই ছিল স্বাভাবিক। এবং হয়েছেও তাই। তিনি লিখলেন প্রশংসা পেলেন- পুরস্কারও। ঠিক তখনই, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দারিদ্র্যের দীর্ঘ ছায়া, ক্ষুধার লেলিহান শিখা। একদিকে আবেগের প্রেরণা, অন্যদিকে বাস্তবতার আঘাত। দেখা গেল, মেট্রিকুলেশন পর্যন্ত পরপর তিনটি জায়গিরে তাকে থাকতে হয়েছে। দারিদ্র্য ও ক্ষুধাজর্জরিত সেই দিনগুলোর কথা তিনি ভুলতে পারেননি। সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থের (‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’, ১৯৮৫) গদ্য ভাষ্যে তিনি বলেছেন- ‘দারিদ্র্য, দুর্ভাবনা, উৎসাহ পুরস্কার, ভালোবাসা আর স্বপ্ন এসব নিয়ে আমার যে পিরোজপুর তাকে ছেড়ে এসেছি প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে।… বেরিয়ে এসে সেই যে পা রাখলাম মহানগরী কলকাতায় তারই নাম জীবনসংগ্রাম।’ এ সংগ্রাম তার এবং তার কালের, তার সমাজের।

‘রেখে যায় পদচিহ্ন। জাগে কোনো নতুন প্রবাহ-
ভেসে যায় সে প্রবাহে একক অথর্ব জীবনের
দুস্তর দুঃসহ বাধা।
এক স্বপ্ন সহস জনের।

[‘মুত্যু’]

৩.
ওই সংগ্রামশীলতার শিল্পিত পরিণাম ‘রাত্রিশেষ’। কলকাতার কমরেড পাবলিশার্স থেকে ১৯৪৭ সালে এ কাব্য প্রথম প্রকাশিত হয়। বইটি আবার প্রকাশিত হচ্ছে। যারা সমকালীন কবিতার ঐতিহ্য নিয়ে ভাবতে চান, এটা তাদের জন্য সুসংবাদ। কেন- তা খুলে বলি। পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রসরতার ফলে কলকাতানিবাসী মধ্যশ্রেণীর একটি অংশ রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কবিতার উন্মেষ ঘটান। তার বিকশিত রূপ অনন্তর বাংলা সাহিত্যের রূপ পাল্টে দেয়। এ ধারার কবিতা-রচনার ক্ষেত্রে বাঙালি-মুসলমান কবিরা তখনও পিছিয়ে,- প্রায় এক থেকে দেড় দশক। সে ক্ষেত্রে প্রথম প্রজন্মের কবি হিসেবে আমরা যাদের পেয়েছি তাদের মধ্যে স্মরণযোগ্য আহসান হাবীব (১৯১৭), ফররুক আহমদ (১৯১৮) ও আবুল হোসেন (১৯২১)।

কাব্য রচনায় তারা যখন সক্রিয় হচ্ছিলেন, কলকাতা শহর তখন উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উত্তেজনায় তরঙ্গিত। বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘের তৎপরতা, ভারতীয় মুক্তি আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পাকিস্তান আন্দোলন, দাঙ্গা মন্বন্তর ইত্যাদি ঘটনা প্রবাহ সমকালের চিন্তাজগতে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ইতিহাসের এ দায়ভার চল্লিশের দশকে বিশেষভাবে পুঞ্জীভূত হল। পূর্বোক্ত তিনজন কবি সেই পটভূমিরই জাতক।

৪.
বিশিষ্ট সাহিত্য বিচারক স্যামুয়েল জনসন মনে করেন ব্যক্তিপ্রতিভার যথার্থ মূল্যায়ন করতে হলে তৎসাময়িক কালের বাস্তব প্রেক্ষাপটকে সম্যক গুরুত্ব দিতে হবে। জনসনের অভিমতের (Lives of English Poet’ 1779) আলোকে দেখা যায়, সমকালের দাবি ও সমাজ মনস্তত্ত্ব সৃজনশীল রচনাকর্মে সহজে উপেক্ষিত হয় না।

আলোচ্য তিনজন কবির ক্ষেত্রেও আমরা দেখি, তাদের সত্তাবিকাশের প্রশ্নটি জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক শোষণ ও শাসন থেকে মুক্তিলাভের আশায় পূর্ববঙ্গের কৃষিপ্রধান জনসমাজ নতুন রাষ্ট্রখণ্ডের যে স্বপ্ন দেখছিল স্বপ্নদেখার সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা এ কবিদের আরাধ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ফলে, পরাজয়ের গ্লানিমুক্ত নতুন সমাজগঠনের স্বপ্ন তাদের কবিতায় উদ্দীপিত হয়।

‘দ্বারপ্রান্তে তোমাদের বন্দী আমি দুই শতকের
আমার আত্মার তলে অগ্নিশিখা সাতান্ন সনের
আজো অনির্বাণ’,

[‘সেতু-শতক’]

এই তিনজন কবির প্রথম কাব্যের নামকরণগুলো অনুধাবন করা যাক।- ‘লাহোর প্রস্তাব’ পাসের বছরে (১৯৪০) প্রকাশিত গ্রন্থের নাম দাঁড়াল ‘নববসন্ত’। সঠিক নেতৃত্বের সন্ধানে উদগ্রীব কবিমানসে মডেলরূপে উদ্ভাসিত হয় ‘সাত সাগরের মাঝি’ সিন্দাবাদ। শোষণমুক্তির অঙ্গীকারে উজ্জীবিত নতুন রাষ্ট্রখণ্ডের অভ্যুত্থানের বছরটি (১৯৪৭) বিবেচিত হল, ‘রাত্রিশেষ’ রূপে।

প্রসঙ্গত বলা দরকার, কাব্যরীতির বিচারে তাদের মধ্যে অভিন্নতা থাকলেও রুচি ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে তারা আলাদা। আবুল হোসেনের মধ্যে বুর্জোয়া মধ্যবিত্তের মানসিকতা লক্ষ করা যায়। ফররুখ আহমদ পশ্চাৎপদ মুসলমান-সমাজের জাগরণ ও উত্তরণ নিয়ে বিশেষভাবে ভাবিত। সেই তুলনায় আহসান হাবীব সমাজবাদসম্মত মূল্যবোধের ধারক ও বাহক। ‘রাত্রিশেষ’ কাব্যের ‘কনফেশান’ শীর্ষক কবিতার প্রথম চরণেই ধ্বনিত হয়- “আমরা কবিতা লিখি ‘প্রোলেটারিয়ান’।” এবার আমরা দেখার চেষ্টা করব- তার ভাবনার জগতে কারা স্থান নিয়েছে। তিনি কাদের চেনেন, তাকে কারা চেনে- সেই পরিচয়ও সন্ধান করব। আলোচনার সুবিধার্থে পঞ্চাশ দশকের উদীয়মাণ মধ্যবিত্তের প্রতিভূ শামসুর রাহমানের (১৯২৯) ‘আত্মপ্রতিকৃতি’ শিরোনামের কবিতাটির অংশ বিশেষ পরখ করা যাক।-

‘আমি তো বিদেশী নই, নই ছদ্মবেশী বাসভূমে
না, তারা জানে না কেউ আমার একান্ত পরিচয়
অথচ নিঃসঙ্গ বারান্দার
সন্ধ্যা, এভেন্যুর মধ্যরাত্রির স্তব্ধতা, সার্কাসের
আহত ক্লাউন আর প্রাচীরের অতন্দ্র বিড়াল,
কলোনির জীবনমথিত ঐকতান, অপ্সরীর
তারাবেঁধা কাঁচুলি, গলির অন্ধ বেহালাবাদক
ব্রাকের সুস্থির মাছ, সেঁজার আপেল জানে কতো
সহজে আমাকে,…’

[‘রৌদ্র করোটিতে’, ১৯৬৩]

উল্লিখিত কবিতায় আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতাবোধের পরিচয় রয়েছে। তার সঙ্গে জড়িত রয়েছে ব্যক্তিসত্তার স্বরূপজনিত সংকট। যাদের সঙ্গে কবির নিত্য যোগাযোগ, তারা কেউ কবির প্রকৃত পরিচয় জানে না। সেভাবে তিনি নিজের পরিচয় দিতে চেয়েছেন, তাতে অবস্থা-সম্পন্ন শিক্ষিত শ্রেণীর রুচি ও মননশীলতা প্রতিভাত হয়েছে।

সেই তুলনায় বলা যায়, আহসান হাবীব ক্ষয়িষ্ণু অথবা নিু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি- ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রামের নির্মম অভিজ্ঞতা যার রয়েছে। ‘আমি কোনো আগন্তুক নই’ (‘দু’হাতে দুই আদিম পাথর’, ১৯৮০) শীর্ষক কবিতায় তিনি জানাচ্ছেন-

‘মাছরাঙা আমাকে চেনে
আমি কোনো অভ্যাগত নই
কার্তিকের ধানের মঞ্জুরী সাক্ষী
সাক্ষী তার চিরোল পাতার
টলমল শিশির, সাক্ষী জ্যোৎস্নার চাদরে ঢাকা
নিশিন্দার ছায়া
অকাল বার্ধক্যে নত কদম আলী
তার ক্লান্ত চোখের আঁধার
আমি চিনি, আমি তার চিরচেনা স্বজন একজন। আমি
জমিলার মা’র
শূন্য খাঁ খাঁ রান্নাঘর শুকনো থালা সব চিনি
সে আমাকে চেনে।
মাটিতে আমার গন্ধ, আমার শরীরে
লেগে আছে এই স্নিগ্ধ মাটির সুবাস।’

৫.
জীবনের শুরু থেকেই নিজের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে আহসান হাবীব সচেতন ছিলেন। অভাব-অনটন-দারিদ্র্য-সংগ্রাম তার জীবনে তত্ত্ব নয়, বাস্তব সত্য। তিনি যখন জঠরের ক্ষুধার কথা বলেন, তখন তার অভিজ্ঞতাই কথা বলে। ‘রাত্রিশেষ’ কাব্যে অস্তিত্বের যে সংকট, তা নিরেট বাস্তব। এ হেন বাস্তবতার চাপে ভেঙে পড়াই ছিল স্বাভাবিক, হতাশ হওয়াই ছিল যৌক্তিক; কিন্তু তিনি তা হননি।

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি বারবার আশায় উদ্দীপিত হয়েছেন।

‘এই নিয়ে বারবার নতুন দিনের বাসনায়
বেঁধেছি অনেক বাসা মৃত্যুমুখী দিনের সীমায়।’

[‘ঝরাপলাশ’]

এই প্রাণশক্তির উৎস তার মর্মমূলে নিহিত। তার মানসগঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে- তিনি অস্তিত্বপরায়ন, প্রত্যয়নিষ্ঠ ও সংগ্রামশীল। এ কারণে অনায়াশে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারেন।-

‘ঝরাপালকের ভস্মস্তূপে তবু বাঁধলাম নীড়
তবু বারবার সবুজ পাতার স্বপ্নেরা করে ভীড়।’

[‘এই মন-এই মৃত্তিকা’]

আবার স্মরণ করি, কলকাতায় পাড়ি জমানোর কালে (১৯৩৫) এই ‘স্বপ্ন’ই ছিল বড় এক পুঁজি। এই স্বপ্নই তার চালিকাশক্তি, এই স্বপ্নই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

আহসান হাবীবের মধ্যে প্রণয়াবেগ ও শ্রেণীচেতনা…সহাবস্থান লাভ করে।

দরিদ্র যেখানে বাস্তব, প্রেমের মতো কবিতাও সেখানে বিলাসিতা বৈকি। এর বিপরীতে, কবিতার সংগ্রামী ভূমিকার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এ ছাড়াও, কবিতা চৈতন্যের মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে। তা না হলে দারিদ্র্যকে শিরোধার্য করে কবিরা কবিতা লেখেন কীভাবে! অতএব মানতেই হয়, অন্তর্গত প্রেরণার নিজস্ব এক শক্তি আছে। সেই শক্তির প্রতিধ্বনি আহসান হাবীবের উচ্চারণে বিদ্যমান। ‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’ কাব্যের গদ্যভাষ্যে তিনি বলেছেন- ‘আজ আমি বলি, অহংকার করেই বলছি, পরাক্রান্ত ক্ষুধাকে আমি কবিতার ওপরে হুকুম চালাতে দিইনি।’

দারিদ্র্যের মুখোমুখি প্রখর আত্মমর্যাদা বোধে দীপ্ত এ মানুষটিকে অকৃত্রিমভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে ‘রাত্রিশেষ’-এর কবিতায়। সেখানেই তার ইতিহাস, তার কালের বিশেষ ইতিহাস,- যার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে পরবর্তী বাংলা কবিতার।

 

আজ এই মহান কবির ১০২তম জন্মদিন। বরিশালট্রিবিউনের পক্ষ থেকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
মে ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« এপ্রিল    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
Website Design and Developed By Engineer BD Network