১৮ই জুন, ২০১৯ ইং, বুধবার

হেনরী স্বপনকে গ্রেফতার বনাম ‘we are concern’ তত্ত্ব

আপডেট: মে ১৭, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

সৈয়দ মেহেদী হাসান : ‘অদ্ভুদ আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা’-কবি জীবনানন্দ দাশের অমর উক্তি গোয়ারের মত তারা করে ফিরছে। কি বুঝে জীবনানন্দ এমন উচ্চারণ করেছিলেন তা হয়তো ত্রিশের দশকে কেউ বোঝেনি; বুঝেছে চলমান দ্বিতীয় দশকে এসে। যখন কবিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সন্ত্রাসীর মত, যখন মুক্তবাক চেপে ধরা হয় ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষঢেলে। যখন মামলা দায়েরের আগে কবি চালান হয়ে যায় আদালতে; গারদের ইন্সপেক্টর সাংবাদিক দেখে আসামী গ্রহনের কাগজ খুঁজে পান না। তখন বোঝা যায় বাংলাদেশে জ্ঞাণ চর্চার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমরা অবাক হই। ভয়ে থাকি-উদ্রেগ হয় মনে, কবিতা লিখে, সংবাদ প্রকাশ করে কবে আবার বন্দুকযুদ্ধে কণ্ঠ থামিয়ে দিতে হয়।

 

খ্রিস্টান মৌলবাদীদের উস্কানিতে প্রশাসনের চোখে উল্লেখিত চরিত্রের সাথে মিল পেতে পারে লুকোচুরি প্রিয় পুলিশ-প্রশাসন। তবে একজন কবি হিসেবে, সহকর্মী সাংবাদিক হিসেবে আমার বা আমাদের কাছে কল্পনায়ও এসব আসে না। বরিশালের শিল্প-সংস্কৃতি ঋদ্ধ করতে বর্তমানে যে একটিমাত্র ম্যাগাজিন বিনামূল্যে বিতরণ করে তা দৈনিক মতবাদের সাপ্তাহিক প্রকাশনা ইতিবৃত্ত। সেই ইতিবৃত্তের সম্পাদক হেনরী স্বপন। বাংলা সাহিত্যে তার অবদানের প্রসঙ্গ নাইবা টেনে আনলাম। তবে একটি বিষয়ে আবারও বলতে হয় হেনরী স্বপনকে গ্রেফতার করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সুউচ্চ কণ্ঠকে চেপে ধরার ধৃষ্ঠতা দেখানো হয়েছে। এটি মৌলবাদীদের অহমে আরও একটি পালক জুড়েছে, জঙ্গীদের আস্কারা দিয়েছে ধর্মের অজুহাতে একমাত্র বাংলাদেশে স্বাধীনতার মানুষদের লাঞ্ছনা-গঞ্জণা দেওয়া যায়। হেনরী স্বপনদের কারাগারে রাখলে বাংলাদেশ পাহাড়া দিবে কারা-আমি জানি না।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হলো আরও একটি। মঙ্গলবার গ্রেফতার হলেন হেনরী স্বপন। বুধবার গ্রেফতার হলেন লেখক ও আইনবীদ ইমতিয়াজ মাহমুদ। স্মৃতিভ্রম না হলে লেখালেখির জন্য প্রসিদ্ধ কবিকে গ্রেফতারের সংস্কৃতি হেনরী স্বপনকে দিয়ে বরিশালে শুরু হলো। আবার পরপর দুইদিনে দুইজন লেখক গ্রেফতারের ইতিহাস শুরু হলো ইমতিয়াজ মাহমুদকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে।
আমি দৈনিক মতবাদের বার্তা সম্পাদক। আর একই গ্রুপের সাপ্তাহিক ইতিবৃত্তের সম্পাদক হেনরী দাদা।

 

চলমান-স্বস্তা সংবাদ নিয়ে আমার কারবার; হেনরী স্বপন খোঁজেন শিল্প-সংস্কৃতির আলো না পড়া পথ। একই ডেস্কে তবে সারাক্ষণ আলাপ-আলোচনায় থাকে দেশ; মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনীতির হালচাল নিয়ে। আবার ২০১৫ সালে আনসার বিডি নামে একটি ফেসবুক পেইজ থেকে আমি, কবি হেনরী স্বপন, তুহিন দাস, গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী নজরুল বিশ্বাস, চারু শিল্পী চারু তুহিন ও ব্লাগার প্রীতম চৌধুরীকে যে হুমকি দিয়ে ছিলেন তখনও দাদা ভীত সন্ত্রস্ত ততটা ছিলেন না। তখন দাদা বলতেন, লিখে দরকার হলে খুন হবো। তবু মৌলবাদের কাছে মাথা নত করবো না। কিন্তু ২০১৯ সালের মে মাসের ১২ তারিখ (রবিবার) সকালে দেখেছি কতটা ভীত ছিলেন তিনি। তার চোখেমুখে ভয় কাজ করতে দেখেছি।

 

তাকে গ্রেফতারের এক দিন আগের ঘটনা। সকালে ডেস্কে কাজ করছি। দাদা এসে জানালেন, তাকে বাসায় গিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে আসা হয়েছে। দাদার সাথে আমিও স্বন্ত্রস্ত হলাম, একা বাসা থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরলেন কিভাবে! শেষে থানায় জিডি করতে গেলাম। থানার ওসি নূরুল ইসলাম সাহেব তখন খুব ব্যস্ত। পরের দিন ওপেন হাউজ ডে। সেই আয়োজনে এতই ব্যস্ত যে বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক স্বপন খন্দকারসহ কয়েকজন যারা ছিলাম তারা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে দর্শন পেলাম। তার আগে দুই টেবিল অবশ্য ঘুরেছে হেনরী স্বপনের দেওয়া জিডির আবেদন।

 

ডিউটি অফিসার জানান, ওসি স্যার তদন্ত স্যারকে রাখতে বলেছে। তিনি টেলিফোনের বাটন টিপে কল দিলেও তদন্ত স্যার কল রিসিভ করলেন না। তখনই ধারণা হয়-এই আবেদন নিয়ে পুলিশ হেলাফেলা করবে। শেষে সেকেন্ড অফিসারের কক্ষে নিয়ে গিয়েও জিডিটি রাখার অনুমতি না পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ডিউটি রুমে চুপ করে বসলেন। ডিউটি অফিসার বললেন, ওসি স্যার আপনার সাথে কথা বলবেন। অপেক্ষা করতে বলেছে। তারপর সবাই অপেক্ষা করলাম। শেষে জানা গেল থানা চত্বরের মাঠে ওসি সাহেব কথা বলছেন। সেখানে গিয়ে ওসি সাহেবের হাতে জিডির কপিটা দিলে তিনি না দেখেই সেকেন্ড অফিসারের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, পরে দেখবো। তখন আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। মনে মনে লজ্জা পাই। কারণ যারা সেখানে উপস্থিত তাদের অসম্মান দেখানোর মত হীনমানসিকতা সুস্থদের মনে আসবে না।

 

এর আগে জিডিটি নেওয়ার জন্য বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি পুলক চ্যাটাজী, রির্পোটার্স ইউনিটির সভাপতি নজরুল বিশ্বাসের মত মানুষেররা ওসিকে অনুরোধ জানান পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। অনুরোধ জানান তারা যেন কারও উস্কানিতে কাউকে হয়রানি না করেন। ওসি সাহেব সবাইকে বলেন, দেন পাঠিয়ে দেন। এ যেন মায়ে তৈরী করে-ছেলে বিক্রি করে পিঠা; এমন সিস্টেম। তাদের আশ্বাসে জীবনের নিরাপত্তা চাইতে গিয়ে থানায় ওসি সাহেবের ভাবগতিক দেখে আমরা অপমানিত হয়েছি।

 

শুধু আমরা না, অল্পদিনে সাংবাদিক নির্যাতন করে নাম কামানো ওসি সাহেব অপমান করেন মুঠোফোনে কথা বলা লোকদেরও। ওসি যদি জিডি না নিতেন বলতেই পারতেন। কিন্তু বললেন না। আমরা জেনেছি খ্রিস্ট্রান সম্প্রদায়ের হলেও ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের পর নগরীতে অগ্নি সংযোগ-পিকেটিং করে আলোচনায় আসা যুবদলের নেতা এলবার্ট রিপন বল্লভের সাথে ওসি নূরুল ইসলামের গলায় গলায় খাতির। আমার ধারণা, এলবার্ট রিপন ওসি সাহেবকে অনুমতি দেননি হেনরী স্বপন কর্তৃক প্রদত্ত জিডিটি নথিভূক্ত করার জন্য; সেকারনেই নূরুল ইসলাম সাহেব জিডিটি নেননি। নয়তো বাংলাদেশের কোন থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করতে গেলে তা নিতে টালবাহানা করে বলে আমার জানা নেই।

 

সেই ইতহাস সৃষ্টি করলেন নুরুল ইসলাম। গ্রেফতারের আগের দিন অর্থাৎ সোমবার ওপেন হাউজ ডে-তে মাত্র একজন ফাদার যোগ দিয়েছিলেন সেখানে। কথা হলো নগরীর উল্লেখযোগ্য কোন মাওলানা, পুরোহিত নিমন্ত্রন পেয়েছে কিনা নিশ্চিত নই। এমনকি গণমাধ্যমকর্মীরাও এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েছে বলে কোন তথ্য জানি না। কিন্তু ঘুরঘুর করা সাদা পোশাকধারী সেই কাথলিক ফাদারকে সবার শেষে যাচিয়ে কথা বলতে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন ওসি নিজে বলে জানিয়েছেন যারা সেখানে গিয়েছিলেন তারা। সেই ফাদার অনেকগুলো কাগজ নিয়ে গিয়েছিলেন; সেই কাগজ দেখে তিনি মাইকে বলেছিলেন কারিতাসের সাথে হেনরী স্বপনের একটি জমি বিরোধ রয়েছে-সেই প্রসঙ্গে।

 

সেখানে আসেনি খ্রিস্টান ধর্ম নিয়ে হেনরী স্বপনের স্ট্যাটাসের কথা। তাহলে কি ভেবে নেব আলবার্ট রিপন ও আলোচিত ওসি মিলে জমির বিরোধের জের পুরোন করেছেন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার কূটচালে? ঘটনা যদি আপনি তলিয়ে দেখতে যান তাহলে দেখতে হবে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আসলে কার আঘাত লেগেছে? ধর্ম যাজক ফাদার ল্যাকাভালিয়ের গোমেজ নাকি হেনরী স্বপনের? ক্ষুদ্র জ্ঞান থাকলেই বোঝা যায়, আঘাতটা লাগার কথা হেনরী স্বপনের। কারণ তিনি কি অযৌক্তিক কথা বলেছেন? প্রশ্নে সমাধান করুন- যিশুর আদর্শ বড় হবে নাকি বিশপ সুব্রত হাওলাদারের আদর্শ বড় হবে? শ্রীলংকায় যখন মৌলবাদীদের হামলায় লন্ডভন্ড তখন বরিশালের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা নাচ-গানে মশগুল বিশপ সুব্রত।

 

এটা কি ধর্মে আঘাত হানে না? হেনরী স্বপনতো সেই কথাটাই বলেছেন। তাতে আঘাত লাগবে কি কারনে? যিশুতো কাউকে অমানবিক হতে বলেননি। বাইবেলের কোন অনুচ্ছেদে এই কথা উল্লেখ নেই। তিনি দানবের হাত থেকে মানবিকতাকে উদ্ধার করেছিলেন। অথচ শ্রীলংকায় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর আইএস দানবিকতা চালাচ্ছিল তখন; বরিশালের খ্রিস্টানরা ধর্মের নামে ফূর্তি করছিল। এটা হেনরী স্বপন না আমারও বিবেকে প্রবল কড়াঘাত করে। যখন হেনরী স্বপনের মুখ থেকে বের হলো-তখন খ্রিস্টান সম্প্রদায় দেখলো তাদের ধর্মের বেড়াজালে যিশুর আদর্শের বাইরে গিয়ে ধর্ম চর্চার গোমর ফাঁস হয়ে গেছে-তখন ক্ষেপে গেলেন।

 

এটা মানা যায় না যে, জমি বিরোধ আর সমালোচনার জের মেটাবেন ধর্মের ডামাডোলে। মামলায় আরও দুজন আসামি করা হয়েছে-যারা প্রসিদ্ধ লেখক নন। এদের একজন ভিডিও সাংবাদিক জুয়েল সরকার। বাকিজন জুয়েল সরকারের ভাই। কথা হলো ধর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন হেনরী স্বপন। তাহলে এরা কেন হলো আসামী? ওই যে জমি বিরোধ। আরও স্পষ্ট করি; দীর্ঘদিন ধরে জুয়েল সরকারের পরিবারের সাথে জমি বিরোধ চলে আসছিলো এ্যালবার্ট রিপন বল্লভের।

 

সিনিয়র সাংবাদিক ও সাংবাদিক নেতারা জমি বিরোধ নিয়ে হেনরী স্বপন, জুয়েল সরকার ও তার ভাই আলফ্রেড সরকারের বিষয়ে খ্রিস্টান এ্যাসোসিয়েশনের বরিশাল শহর শাখার সাধারণ সম্পাদক এ্যালবার্ট রিপন বল্লভের সাথে কথা হয়। যখন উভয় পক্ষের মধ্যে মানসিক উত্তেজনা তুঙ্গে তখন বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা চালিয়েছিলেন শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন। এ্যালবার্ট রিপনকে জানিয়েছিলেন-উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধান করার জন্য। তখন রিপন বল্লভ, ব্রিটিশ হাইকমশিনারের বরাত দিয়ে বলেছিল-হেনরী স্বপনের বিষয়ে হাই কমিশনারকেও জানানো হয়েছে। এমনকি রিপন বল্লভ বলেন, ভেটিকান সিটির পোপ জানেন বিষয়টি।

 

প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিস্ময় প্রকাশ করেন-ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়টি ভেটিকানের পোপ জানেন! তখন এ্যালবার্ট রিপন বল্লভ জানান, ‘উই আর কনসার্ন’। রিপন বল্লভকে বলতে চাই, আপনি কনসার্ন। আর আপনার ষড়যন্ত্রের বিষয়ে অলরেডি আমরাও কনসার্ন। জমি বিরোধ যিনি ধর্মের ওপর বর্তাতে পারেন, সেই নেতাতো যিশুর আদর্শের নেতা হতে পারে না। আর যিনি প্রকৃত ঘটনা না জেনে একপক্ষের অভিযোগ নেন তিনি কি আইনের সেবক নাকি আইন বিক্রি করে চলা ওসি? সেটিও প্রশ্ন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি ধর্মের কোন অনুভূতি নেই। অনুভূতি আছে ধর্মের অনুসারিদের। এই অনুভূতি যেকোন ইস্যুতে প্রবল আকার ধারণ করতে পারে। পার্থিব মোহ-মতান্তর নিয়ে বিরোধ হলেই পবিত্র ধর্ম নিয়ে ব্যবসায় নেমে পরেন এক ধরণের ভন্ড। এখানেও তার ব্যত্যয় হয়েছে বলে আমি মনে করি না।

 

পুনশ্চ: মুঠোফোনে কথা হলে ওসি সাহেব জানান, কেন ! হেনরী দাদার জিডিতো আগেই গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ, জেনারেল রেজিস্ট্রার্ড অফিসার (জিআরও) ১৫ মে জানান-সকালে তিনি জিডির কপি পেয়েছেন। কি বিচত্রি মানুষ। মানুষ কত মিথ্যা কথা বলতে পারে। ভাবুন।

লেখক : সভাপতি নিউজ এডিটরস কাউন্সিল, বরিশাল।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
জুন ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« মে    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
Website Design and Developed By Engineer BD Network